বাংলাদেশে মুসলিম পারিবারিক আইন (১৯৬১) অনুযায়ী তালাক দেওয়ার সঠিক নিয়ম
হলো লিখিত নোটিশ প্রদান। স্বামী বা স্ত্রী যে কেউ লিখিতভাবে অন্যপক্ষকে
তালাক দিতে পারেন । তালাকের সিদ্ধান্ত জানানোর পর স্থানীয় চেয়ারম্যান/মেয়রকে
নোটিশ দিতে হয়। নোটিশ প্রাপ্তির ৯০ দিন পর তালাক কার্যকর হয়। মৌখিক বা একবারে তিন
তালাক দেওয়া আইনত অবৈধ ও দণ্ডনীয়।
তালাক দেওয়ার সঠিক আইনগত
পদ্ধতি (২০২৫ আপডেট):
লিখিত তালাকনামা: তালাক অবশ্যই লিখিত হতে হবে।
নোটিশ পাঠানো: স্বামীকে বা স্ত্রীকে তালাকের নোটিশ ডাকযোগে বা সরাসরি পাঠাতে হবে
।সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিতকরণ: একই নোটিশের একটি অনুলিপি সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন
পরিষদ চেয়ারম্যান, পৌরসভা বা সিটি
কর্পোরেশনের মেয়রের কাছে পাঠাতে হবে।
ইদ্দত ও কার্যকর সময়: নোটিশ প্রাপ্তির তারিখ থেকে ৯০ দিন (৩ মাস) পর
তালাক কার্যকর হয়।
সমঝোতা বৈঠক (আর্বিটেশন কাউন্সিল): নোটিশ পাওয়ার ৩০ দিনের
মধ্যে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সমঝোতার জন্য আর্বিটেশন কাউন্সিল বা
সালিশি পরিষদ গঠন করবেন।
বকেয়া পাওনা: তালাক কার্যকর হওয়ার আগে স্বামী স্ত্রীর
দেনমোহর ও ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ পরিশোধ করতে বাধ্য থাকেন।
বিশেষ সতর্কবার্তা:
মৌখিক তালাক: মুখে "তালাক, তালাক,
তালাক"
বলা আইনত অবৈধ। এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ ।
কাবিননামা: তালাকের সময় কাবিননামার ১৮ ও ১৯ নং কলামে
প্রদত্ত ক্ষমতা ব্যবহার করা হয়।
রেজিস্ট্রেশন: ভালো কাজি অফিস বা আইনজীবীর মাধ্যমে তালাক
নিবন্ধন বা রেজিস্ট্রি করা নিরাপদ।
দ্রষ্টব্য: আইনগত জটিলতা এড়াতে আইনজীবী বা বিবাহ রেজিস্টারের
(কাজি) পরামর্শ নেওয়া উচিত।
তালাক প্রক্রিয়ায়
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
তালাক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রের প্রয়োজন হয়।
প্রথমত, বিবাহ নিবন্ধন
সনদ (Nikahnama)
প্রয়োজন, যা বিবাহের বৈধতা প্রমাণ
করে। এরপর জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) লাগে উভয় পক্ষের পরিচয় যাচাইয়ের জন্য।
তালাকের জন্য একটি লিখিত তালাক ঘোষণা পত্র তৈরি করতে হয়, যেখানে বিবাহের তথ্য ও
তালাকের কারণ উল্লেখ থাকে। চেয়ারম্যান বরাবর পাঠানো তালাক নোটিশের রশিদ সংরক্ষণ
করতে হয়, কারণ এটি আইনগত
প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া প্রয়োজনে সাক্ষীদের নাম ও তথ্য সালিশি পরিষদের
শুনানিতে উপস্থাপন করা যেতে পারে।
অবৈধ তালাকের উদাহরণ
বাংলাদেশে তালাক প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট আইনগত ধাপ অনুসরণ না করলে
সেটি অবৈধ ও অকার্যকর (Invalid Divorce) হিসেবে গণ্য হয়। যেমন— শুধুমাত্র মৌখিকভাবে “তালাক” বলা
আইনত বৈধ নয়। একইভাবে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বরাবর নোটিশ না পাঠালে, বা ৯০ দিনের অপেক্ষাকাল
শেষ হওয়ার আগে নতুন বিয়ে করলে, সেটিও অবৈধ তালাক হিসেবে ধরা হয়।
অর্থাৎ, তালাককে
কার্যকর করতে হলে অবশ্যই লিখিত ঘোষণা, চেয়ারম্যানকে নোটিশ প্রেরণ, সালিশি পরিষদের গঠন এবং ৯০
দিনের অপেক্ষাকাল— এই সব ধাপ সঠিকভাবে সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক।
স্ত্রী কি তালাক দিতে পারে?
হ্যাঁ । মুসলিম নারী তালাক-তাফওয়িজ
(Delegated
Divorce) অধিকার থাকলে নিজে তালাক দিতে পারেন।
এছাড়া Family
Court এর মাধ্যমে খুলা (Khula) তালাকের আবেদন করেও বিবাহ বিচ্ছেদ করা যায়, যদি স্বামী তালাক দিতে অস্বীকৃতি জানান।
তালাকের পর স্ত্রী খোরপোষ
পাবে কি?
হ্যাঁ। স্ত্রী ইদ্দত সময়ের মধ্যে খোরপোষ
(Maintenance) পাওয়ার অধিকার রাখে।
তাছাড়া, দেনমোহর, যৌতুক, সন্তান লালন-পালনের খরচ
ইত্যাদিও আদালতের মাধ্যমে আদায় করা সম্ভব, Family Court Ordinance, 1985 অনুযায়ী।
তালাকের পর সন্তান কার
কাছে থাকবে?
সন্তানের হেফাজত নির্ধারণ হয় Guardian and Wards Act, 1890 অনুযায়ী।
সাধারণত
ছোট শিশু ও কন্যা সন্তান মায়ের কাছে থাকে, তবে আদালত সন্তানের কল্যাণ (Welfare) বিবেচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন।
তালাকের সময় দেনমোহর কিভাবে আদায় করা যায়?
তালাকের সময় স্ত্রী তার দেনমোহর ও
অন্যান্য পাওনা Family Court-এ মামলা করে আদায় করতে পারেন।
আইন
অনুযায়ী স্বামী তালাকের সময় স্ত্রীকে দেনমোহর পরিশোধ করতে বাধ্য।
